রবিবার, ২৮ Jun ২০২৬, ০২:৩৮ পূর্বাহ্ন
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত, ঠিক সে সময় রেকর্ড রপ্তানি আয় হয়েছে বাংলাদেশের। সদ্যসমাপ্ত ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৫ হাজার ২০৮ কোটি ২৬ লাখ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৭১১ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সা হিসেবে)। রপ্তানি আয়ের এ পরিমাণ আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এত বেশি রপ্তানি আয় আসেনি।
গতকাল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করেছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূলত তৈরি পোশাক খাতে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধির কারণেই সর্বশেষ অর্থবছরে রেকর্ড রপ্তানি আয় এসেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৪ হাজার ২৬১ কোটি ৩১ লাখ ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে শুধু তৈরি পোশাক নয় এ সময় কৃষি, চামড়া ও হোম টেক্সটাইল রপ্তানিতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্যে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলেও রপ্তানি আয় শতকোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এবারই প্রথম তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি এক সঙ্গে শতকোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও ২০২১-২২ অর্থবছরের শেষ মাস জুনেও একক মাস হিসেবে রপ্তানি আয়ে রেকর্ড গড়েছে। এতদিন একক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় এসেছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। আর চলতি জুনে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৯০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের জুনের চেয়ে ৩৭ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। আর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি আয় হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া জুনে রপ্তানি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম রপ্তানি আয় ৫ হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক পার হলো। এর আগে এক অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় এসেছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। এরপর মহামারী করোনার কারণে দেশের রপ্তানি আয় কমে গিয়েছিল। তবে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে এ আয়ে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের জুলাইয়ে লকডাউন ও ঈদের ছুটিতে কারখানা ১২ দিন বন্ধ থাকায় দেশ থেকে ৩৪৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা আগস্ট মাসে দাঁড়ায় ৩৩৮ কোটি ডলারে। এরপর থেকে মে মাস ছাড়া প্রতি মাসেই ৪০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় এসেছে। তৈরি পোশাকে ভর করে ২০২১-২২ অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ৪১৬ কোটি, অক্টোবরে ৪৭২ কোটি ও নভেম্বরে ৪০৪ কোটি ডলার রপ্তানি আয় হয়। এরপর ডিসেম্বরে ৪৯০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার রেকর্ড রপ্তানির পর চলতি জানুয়ারিতে ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ডলার রপ্তানি আয় হয়। ফেব্রুয়ারিতে ৪২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, মার্চে ৪৭৬ কোটি ও এপ্রিলে ৪৭৩ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়। গত আট মাসের টানা ঊর্ধ্বগতির পর মে মাসে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়ায় ৩৮৩ কোটি ডলারে। তবে জুন মাসে আগের সব রেকর্ড ভেঙে রপ্তানি আয় ৪৯০ কোটি ৮০ ডলারে উন্নীত হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ^ব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দেশের রপ্তানি আয়ে এমন উল্লম্ফন রপ্তানিকারকদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। আগামীতেও রপ্তানিতে এমন প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন তারা। গতকাল প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রপ্তানি আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে ইইউ ও যুক্তরাজ্য থেকে। এছাড়া এককভাবে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি আয় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
ইপিবি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের নিটওয়্যারে রপ্তানি আয় এসেছে ২ হাজার ৩২১ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। এ সময় ওভেন পোশাক রপ্তানি করে আয় হয় ১ হাজার ৯৩৯ কোটি ৮৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে তৈরি পোশাক থেকে যে আয় হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।
তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় হয়েছে হোম টেক্সটাইল থেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৬২ কোটি ১৯ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১২৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ১১৬ কোটি ২২ লাখ ও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার আয় হয়েছে।